সহীহ বুখারী শরীফ হাদীস নং ৯৬ || পড়াশোনা সবসময় সবখানে™
হাদীসশিক্ষাইসলামিকপড়াশোনা

সহীহ বুখারী শরীফ হাদীস নং ৯৬

সহীহ বুখারী শরীফ হাদীস

2020-Oct-01 2:50 PM

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনে কাব (রা) নবী করীম হতে বর্ণনা করেছেন, একদিন হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈলদের মধ্যে ওয়াজ-নসীহত করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি অপেক্ষা বড় আলেম আর কেউ আছে কি? এবং সর্বাপেক্ষা বড় আলেম কে? উত্তরে হযরত মূসা (আ) বললেন, আমি সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী বা বড় আলেম। কারণ মূসা (আ) নবী ছিলেন এবং দ্বীনের এলেম নবীদের সমান কারাে হয় না, কিন্তু সরাসরি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করা আল্লাহ্ তায়ালা পছন্দ করলেন না। তাই আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ) এর প্রতি ওহী পাঠালেন হে মূসা! পারস্য ও রােমের মধ্যবর্তী দুনদীর মিলন স্থানে আমার বান্দাদের মধ্য আমার এমন এক বান্দা আছেন, যিনি তােমার অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও আলেম। হযরত মূসা (আ) আল্লাহর দরবারে আরজ করলেন, ইয়া আল্লাহ! কিভাবে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হতে পারে। আমাকে তা বলে দিন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে বললেন, তােমার থলির মধ্যে একটি ভাজা মাছ নিয়ে সফর কর। যে স্থানে গিয়ে ঐ মাছটি জীবিত হবে এবং তােমার কাছ থেকে নিখোঁজ হয়ে যাবে তার আশপাশেই আমার ঐ জ্ঞানী বান্দাকে পাবে। অতঃপর হযরত মূসা (আ) তার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সফর সঙ্গী ও খাদেম হিসেবে ইউশা বিন নুনকে নিয়ে যাত্রা করলেন এবং সঙ্গে করে থলিতে একটি ভাজা মাছ নিলেন হযরত মূসা (আ) খাদেমকে বলে দিলেন, মাছটি নিখোঁজ হওয়ার সাথে সাথেই তুমি আমাকে খবর দিবে। খাদেম বলল, আপনি আমাকে বেশী কাজের দায়িত্ব দেননি। তারপর তারা উভয়ই সমুদ্রের কিনারায় চলতে চলতে এমন এক স্থানে পৌছলেন, যেখানে একটি পাথর ছিল। সেখানে পৌছে তারা উভয়েই পাথরের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। মাছটি জীবিত হয়ে থলি হতে নদীর মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। আল্লাহর কুদরতে এ মাছটি নদীর পানিতে যতদূর চলল, পানির মধ্যে একটি ছিদ্র হয়ে গেল। খাদেম ভাবলেন, হযরত মূসা (আ)-এর নিদ্রা ভঙ্গ করব না, আবার তারা ঘুম থেকে উঠে চলতে আরম্ভ করলেন। দিন রাত চলে যখন ভাের হলাে, তখন মূসা (আ) খাদেমকে বললেন, এবার চলতে চলতে খুব ক্লান্তিবােধ করছি, এবার নাশতা আন, হযরত মূসা (আ) মাছের ঐ ঘটনার পূর্বে কোন রূপ ক্লান্তি বােধ করেননি। যেহেতু মাছের ঘটনার স্থানটি আল্লাহর নির্দেশিত গন্তব্যস্থান ছিল। সে স্থান অতিক্রম করার পরই তার ক্লান্তি বােধ হতে লাগল। খাদেম বলল, হায়! আপনি তাে কিছুই জানেন না। আমরা যখন পাথরের উপর মাথা দিয়ে শুয়েছিলাম, তখন  মাছের এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। কিন্তু আমি তা আপনার নিকট বর্ণনা করতে ভুলে গেছি। শয়তানই হয়তাে তা উল্লেখ করতে আমাকে ভুলিয়ে রেখেছে। খাদেম মাছের পূর্ণ ঘটনা বললেন, মাছের চলার পথে পানির মধ্যে ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে, এতে তারা উভয়ই আশ্চর্যান্বিত হলেন। মূসা (আ) বললেন, এটাইতাে সে স্থান, যে স্থানের খোঁজে আমরা বের হয়েছি। তারপর তারা পুনরায় উল্টা পথে ফিরলেন এবং সেই পাথরের বরাবর এসে দেখলেন, গভীর সমুদ্রের পানির উপর সবুজ রংয়ের মখমলের বিছানায় আল্লাহর এক বান্দা আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। হযরত মূসা (আ) তাকে দেখতে পেয়ে সালাম করলেন। যেহেতু তিনিই খিযির (আ)। সালাম শুনে হযরত খিযির (আ) বললেন, এ জমিনে সালাম কোথা থেকে আসলাে? উত্তরে তিনি বললেন, আমি মূসা (আ)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বনী ইসরাইলের নবী মূসা (আ)? তিনি বললেন হ্যা। অতঃপর মূসা (আ) বললেন, আমি কি আপনার সাথে থাকতে পারি এ উদ্দেশ্যে যে, আপনার আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ জ্ঞান হতে আমাকে কিছু শিক্ষা দিবেন? তিনি বললেন, আপনি আমার সাথে চলতে পারেন, কিন্তু ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। কারণ আল্লাহ্ পাক আমাকে এমন এক প্রকার এলেম দান করেছেন যার রহস্য আপনি অবগত নন, এবং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে অন্য প্রকার এলেম দান করেছেন যা আমি আপনার মতাে তত জানি না। অতঃপর মূসা (আ) বললেন, আমি আপনার সাথে ধৈর্যধারণ করেই থাকব। আমি আপনার কোন কাজের বিরােধিতা করব না। তখন খিযির (আ) মূসা (আ) কে বলে দিলেন আপনি আমার নিকট কোন বিষয় জিজ্ঞেস করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি তা আপনার কাছে ব্যক্ত করি। তারপর তারা নদীর কিনারা ধরে চলতে লাগলেন। নদী পার হওয়ার জন্য তাদের কাছে কোন নৌকা ছিল না এবং পার হওয়ার জন্য কোন নৌকার সন্ধান পাচ্ছেন না, এমন সময় একটি নৌকা তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, তারা নৌকার মাঝির সাথে নদী পার করে দেয়ার জন্য আলাপ করলেন। নৌকার মাঝি খিযির (আ)-কে চিনতে পেরে বিনা পয়সায় নদী পার করে দিবে বলে নৌকায় উঠালেন। নৌকা চলার সময় একটি চড়ুই পাখি নৌকার এক মাথায় এসে বসে সমুদ্রের মধ্য হতে একবার কি দুবার তার ঠোট দিয়ে পানি পান করল। হযরত খিযির (আ) বললেন, হে মূসা! এ চড়ুই পাখিটি ঠোট দিয়ে সমুদ্র হতে যতটুকু পানির অংশ এনেছে আমার ও আপনার সমস্ত এলেম আল্লাহ তায়ালার এলেমের তুলনায় ততটুকুও হবে না। নৌকা যখন অপর তীরে ভিড়ল তখন খিযির (আ) নৌকার একখানা তখৃতা খুলে ফেললেন, এতে মূসা (আ) সহ্য করতে না পেরে বললেন, এরা আমাদেরকে বিনা পয়সায় নৌকায় উঠিয়েছিল আর আপনি তাদের নৌকা ভেঙ্গে বা খুলে ফেললেন যাতে নৌকা তার যাত্রীদেরকে নিয়ে ডুবে যায়। এটা আপনি ভাল করেননি। তখন খিযির (আ) বললেন, আমি আগেই বলেছিলাম, আপনি আমার সাথে  ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। হযরত মূসা (আ) বললেন, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে, আমাকে ক্ষমা করুন। আমার  অপরাধের জন্য আমাকে অবাধ্য মনে করবেন না। মূসা (আ) এবার প্রকৃতভাবে ভুলে গিয়েছিলেন। তারপর তারা পুনরায় পথ চলতে লাগলেন। একস্থানে গিয়ে তারা দেখলেন একটি সুন্দর চেহারার বালক অন্য বালকদের সাথে খেলাধুলা করছে। হযরত খিযির (আ) উক্ত সুন্দর বালকটির মাথার খুলি উঠিয়ে মেরে ফেললেন। হযরত মূসা (আ) বললেন, কোন কারণ ছাড়া আপনি একটি মাসুম বেগুনাহগার একটি বালকের জীবন শেষ করে দিলেন? আপনি বড়ই অন্যায় কাজ করেছেন। হযরত খিযির (আ) বললেন, আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনি ধৈর্য রাখতে পারবেন না। এবার একটু শক্তভাবে বললেন। হযরত মূসা (আ) বললেন, তৃতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করলে আমাকে আর আপনার সাথে রাখবেন না। তখন আমারও আর কোন ওজর আপত্তি থাকবে না। অতঃপর পুনরায় তারা পথ চলতে লাগলেন। তারা একগ্রামের অধিবাসীদের কাছে এসে পৌছলাে এবং গ্রামবাসীদের কাছে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরােধ করলেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারা ঐ গ্রামে দেখতে পেলেন একটি পুরাতন প্রাচীর ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে হযরত খিজির (আ) প্রাচীরটি হাতে ধরে সােজা করার ন্যায় ইশারা করলেন, আল্লাহর কুদরতে সাথে সাথে সােজা হয়ে গেল। তখন হযরত মূসা (আ) বলে উঠলেন, গ্রামবাসীরা আমাদের মেহমানদারী করল না অথচ আপনি ইচ্ছা করলে এ কাজের জন্য তাদের নিকট হতে পারিশ্রমিক আদায় করতে পারতেন।

News all time