শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর || পড়াশোনা সবসময় সবখানে™
শিক্ষাপড়াশোনা

শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর

মুসা বিন নুসাইর

2020-Sep-06 3:59 AM

মানব সভ্যতাকে গড়ে তােলার ক্ষেত্রে যেসব মহান জাতি অবদান রেখেছে তাদের কেউই সম্ভবত যাযাবর আরবদের মত তরবারি ও লেখনীকে সমান সাফল্যের সাথে ব্যবহার করতে পারেনি। মরুভূমির তাঁবু থেকে যাত্রা করে সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ে মধ্যযুগের সবচাইতে শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল তারা, যে সাম্রাজ্য পশ্চিমের আটলান্টিকের তীর থেকে পূর্ব দিকে চীনের মহাপ্রাচীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

আরবদের ভূখণ্ডগত বিজয় চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, অ্যাটিলা বা হ্যানিবলের মত ছিল না, যার অনিবার্য পরিণতি ছিল মানবতা ও সভ্যতার ধ্বংস সাধন। তার পরিবর্তে আরব। বিজেতারা সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধারণ ও পৃষ্ঠপােষকতা করেছে। তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে মহান প্রশাসক ও সংস্কারক হিসেবে। এভাবে তারা বিজিত জাতির মন জয়। করেছে এবং শুধু যে তাদের দৈহিক অস্তিত্বকে শাসন করেছে তাই নয়, বরং তাদের হৃদয়কেও পরিচালনা করেছে। এভাবে আরবরা মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে মহান। বিপ্লব সাধান করে। যে বিপ্লবে মানবিক তৎপরতার সকল দিক অন্তর্ভুক্ত ছিল।

খােলাফায়ে রাশেদীনের যুগে আরবদের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে যারা মুসলিম সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করছেন তারা হচ্ছেন— খালিদ বিন ওয়ালিদ, সা’দ বিন ওয়াক্কাস, আমর বিন আল আস। উমাইয়া খেলাফতের সময় মুসা বিন নুসাইর, তারিক বিন জিয়াদ এবং মােহাম্মদ বিন কাসিম প্রমুখ অন্যতম।

খলিফা ওয়ালিদের আমলে উমাইয়া শক্তি চূড়ান্তরূপে বিকশিত হয়। তার আমলে। সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার কৃতিত্বের দাবিদারদের মধ্যে পূর্ব দিকে মােহাম্মদ বিন কাসিম ও পশ্চিমে মুসা বিন নুসাইরের নাম উল্লেখযােগ্য। দি হিস্টরী অব দ্য অ্যারাবস’ গ্রন্থের লেখক ফিলিপ কে হিট্টি লিখেছেন, “মুসা বিন নুসাইর ও তার সেনাপতির নেতৃত্বে পশ্চিমাঞ্চলের বিজয় পূর্ব দিকে হাজ্জাজ বিন ইউসূফ ও তার সেনাপতিদের বিজয়ের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না।

মুসা বিন নুসাইর ৬৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নুসাইর আমীর মুয়াবিয়ার প্রহরীদলের প্রধান ছিলেন। প্রশাসন হিসেবে মুসার মেধা ও সাহসিকতার কারণে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। খলিফা আবদুল মালিক তাকে বসরার রাজস্ব আদায়কারী নিয়ােগ করেন। পরবর্তীতে তাকে আফ্রিকার গভর্নর হিসেবে নিয়ােগ করা হয়। তার শাসনাধীনে মিশর থেকে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ড ছিল। কঠোর হস্তে তিনি তার এলাকা শাসন করতেন এবং অনেক সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বার্বার উপজাতি নতুন গভর্নরের প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামরিক যােগ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে গ্রহণ করল আপনজন হিসেবে। এরপর মুসা বিন নুসাইর সফল নেতা হিসেবে। অভিযান পরিচালনা করতে শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই আফ্রিকায় আরব শক্তি সংহত হয় এবং আরবরা উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন অধিকার করতে সক্ষম হয়।

মুসা বিন নুসাইর ও তার পুত্ররা একের পর এক সাহসী অভিযান চালিয়ে আফ্রিকার দুর্ধর্ষ উপজাতিগুলাের প্রতিরােধ ভেঙ্গে ফেলেন; গ্রীক ষড়যন্ত্রকারীদের আফ্রিকা হতে বিতাড়িত করেন এবং সমগ্র এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তার বিজ্ঞ প্রশাসন ও আপােসের মনােভাব বেপরােয়া বার্বারদেরকেও আপন করে তােলেন এবং তিনি তাদের আস্থাভাজন হন। মুসা বিন নুসাইর সরাসরি খলিফার অধীনে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। বিজিত জাতিগােষ্ঠীর প্রতি শাসকের সহনশীল আচরণ, সাম্য, ন্যায়বিচার, ভ্রাতৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসা বিন নুসাইর তাদের হৃদয় জয় করেন। অল্প সময়ের মধ্যে গােটা বার্বার জাতি ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তী বছরগুলােতে তারা। ইসলামের দুর্ধর্ষ শক্তিতে পরিণত হয় এবং ইসলামের পতাকাকে ফ্রান্সের কেন্দ্র পর্যন্ত। বহন করে নিয়ে যায়।

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলাে ভূমধ্যসাগরে অবস্থানরত বাইজান্টাইন নৌবাহিনী কর্তৃক নানাভাবে উৎপীড়িত হত। মুসা বিন নুসাইর এই ঝামেলা হতে নিজের শাসনাধীন এলাকাকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে একটি অভিযান পরিচালনা করে কৌশলগত ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মাজেরকা, মিনােরকা ও ইন্ডিকা দখল করেন। ইসমামী শাসনাধীনে আসার পর দ্বীপগুলােতে দ্রুত সমৃদ্ধি সাধিত হতে থাকে। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, “ব্যাপকতার দিক থেকে মুসা বিন নুসাইর এর শাসনের আওতা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রায় সমান। কিন্তু প্রশাসনিক যােগ্যতা ও সামরিক নেতৃত্বের দিক থেকে তার গুরুত্ব আরাে অধিক।

মুসা বিন নুসাইর আফ্রিকা থেকে রােমানদের চিরদিনের জন্য বিদায় করেছিলেন এবং মুসলিম বিজয়কে আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবে মুসলমানদের ইউরােপ অভিযানের পটভূমি তৈরি করেছিলেন তিনি। ৭১০ সালে তিনি স্পেন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তার সুযােগ্য সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে পরবর্তী বছরই মাত্র সাত হাজার সৈন্যসহ তারিককে স্পেন অভিযানে পাঠানাে হয়। রাজা রডারিকের বিশাল বাহিনী ও তারিকের ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে বারবেট নদীর মােহনায় চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটে। রডারিকের নেতৃত্বে খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। তারিকের বাহিনী খ্রিস্টান বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। এই যুদ্ধের পর বিজয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়ে তারিক স্পেনের অন্যান্য এলাকা দখল করার জন্য অভিযানে নেমে পড়েন। এজন্য তাকে খুব সামান্য প্রতিরােধের সম্মুখীন হতে। হয়। কারণ খ্রিস্টান বাহিনীর মনােবল ভেঙ্গে পড়েছিল।

এক বছর পর মুসা বিন নুসাইর স্বয়ং স্পেনে উপস্থিত হন। তার সাথে ছিল ১০ হাজার অমিতবিক্ৰম সৈন্য। তিনি ভিন্ন। পথে ঝড়ের গতিতে অভিযান চালিয়ে মেরিডা, সিডােনিয়া ও সেভিল দখল করেন। টলেডােতে মুসা বিন নুসাইর তার সুযােগ্য সেনাপতি তারিকের সাথে মিলিত হন এবং দুই বিজেতার সম্মিলিত আক্রমণের মুখে খ্রিস্টান বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে করতে পিরেনিজত পর্বতের দিকে চলে যায়। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে সমগ্র স্পেন মুসলিম। শাসনাধীনে চলে আসে। কয়েক বছর পর মুসলিম বাহিনী পর্তুগাল দখল করে এবং পর্তুগালের নামকরণ করা হয় আল গারব (পশ্চিম)।

তারিকের বাহিনীকে স্পেনে রেখে মুসা বিন নুসাইর ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হন এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি অঞ্চল করায়ত্ত করেন। পিরেনিজ পর্বতে দাড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর সমগ্র ইউরােপ বিজয়ের কথা ভেবেছিলেন। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, “তাকে যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়া হত তাহলে তিনি অবশ্যই সফল। হতেন। পাশ্চাত্য সম্পূর্ণরূপে তার পদানত হত। কিন্তু দামেস্কের দরবারে সতর্কতামূলক ও দ্বিধান্বিত নীতি গ্রহণের ফলে মুসলমানদের এই সুবর্ণ সুযােগ হারিয়ে যায়।

মুসা বিন নুসাইর যখন পিরেনিজ পর্বতে মুসলমানদের উপর চোরাগােপ্তা আক্রমণকারী কিছু খ্রিস্টান দল কর্তৃক বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা চিরতরে নির্মূল করার প্রচেষ্টায়। লিপ্ত ছিলেন, তখন খলিফা তাকে ও তারিককে দামেস্কে তলব করলেন। মুসা বিন নুসাইর খলিফার আদেশ অগ্রাহ্য না করে বিজয়ীর বেশে আফ্রিকায় ফিরে আসেন। কিন্তু নতুন উমাইয়া খলিফা সােলাইমান তাকে যথাযথ মর্যাদা সহকারে গ্রহণ করেন নি। মুসা। বিন নুসাইর অবসর জীবন কাটিয়ে ৭১৬ অথবা ৭১৭ সালে সিরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। " স্পেন ত্যাগের পূর্বে মুসা বিন নুসাইর দেশটির শাসন পরিচালনার জন্য প্রয়ােজনীয়। ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করেছিলেন। সেভিলে মুসলিম শাসনের কেন্দ্র স্থাপন করে তার এক পুত্রকে স্পেনের গভর্নর নিয়ােগ করেন। আরেক পুত্র আবদুল্লাহকে আফ্রিকা শাসনের। দায়িত্বে ন্যস্ত করেছিলেন। উভয় পুত্র বিরাট যােদ্ধা ও প্রশাসক ছিলেন।
মুসলিম বিজেতারা যে শৃঙ্খলা প্রদর্শন করে গেছেন তা বিশ্বের সামরিক বিজয়ের ক্ষেত্রে নজীরবিহীন।

যখন সমগ্র ইউরােপ মুসা বিন নুসাইরের পদতলে এবং তিনি বিজয়সূচক অভিযানের জন্য প্রস্তুত ঠিক সেই মুহূর্তে দামেস্ক হতে খলিফার নির্দেশ। আসায় তিনি অভিযান ত্যাগ করে খলিফার নির্দেশকেই শিরােধার্য বিবেচনা করে দামেস্কে রওয়ানা হওয়ার মাধ্যমে এই শৃঙ্খলার নজীর স্থাপন করে গেছেন।

মুসা বিন নুসাইর ছিলেন একজন সেরা যােদ্ধা, যােগ্য সেনাপতি এবং বিজ্ঞ প্রশাসক; সর্বোপরি তিনি ছিলেন কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার হাতে বন্দী। এ ধরনের সুযােগ্য ব্যক্তির মাধ্যমেই ইসলাম তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের সুবিস্তৃত ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভাকেইসর্ডোভাই হিল্লোকেন্দ্রে পাকও ছাড়িয়ে মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন জিয়াদ স্পেনে ইসলামী রাষ্ট্রের যে ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখানে দিনে দিনে মুসলিম সভ্যতার চরম বিকাশ ঘটে। মুসলিম শাসনামলে কর্ডোভাকে ইসলামী ঐতিহ্যে এত সমৃদ্ধ করে গড়ে তােলা হয়েছিল যে, সমগ্র ইউরােপে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভাই ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ও জাকজমকপূর্ণ নগরী। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় ইউরােপের সেরা শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি মিশরের আল আযহার ও বাগদাদের নিজামিয়াকেও ছাড়িয়ে যায়।
ইসলামের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পেনীয় ইতিহাসের ইসলামী যুগকে স্বর্ণযুগ। হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং সেজন্য যদি কাউকে কৃতিত্ব দিতে হয় তাহলে তা অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক মুসা বিন নুসাইরের ।

News all time