শিক্ষা ও মনুষত্ব (গদ্য) (নবম-দশম বাংলা) || পড়াশোনা সবসময় সবখানে™
শিক্ষাবইপড়াশোনা

শিক্ষা ও মনুষত্ব (গদ্য) (নবম-দশম বাংলা)


2020-Jul-05 12:43 PM

মোতাহের হোসেন চৈধুরী

মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা, আর মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব ওপরের তলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও সে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক করে কথায়, তার অন্যতম কাজ। কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অন্য কথায়, শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় দিকও আছে। আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক। সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, কী করে মনো মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায়। শিক্ষার এ দিকটা যে বড় হয়ে ওঠে না, তার কারণ ভুল শিক্ষা ও নিচের তলায় বিশৃঙ্খলা জীবসত্তার ঘরটি এমন বিশৃঙ্খল হয়ে আছে যে, হতভাগ্য মানষকে সব সময়ই সে সম্বন্ধে সচেতন থাকতে হয়। ওপরের তলার কথা সে মনেই আনতে পারে না। অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি। ধনী-দরিদ্র সকলেরই অন্তরে সেই একই ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে : চাই, চাই, আরও চাই। তাই অনুচিন্তা তথা অর্থচিন্তা থেকে মানুষ মুক্তি না পেলে, অর্থসাধনাই জীবনসাধনা নয়- একথা মানুষকে ভালো করে বোঝাতে না পারলে মানবজীবনে শিক্ষা সোনা ফলাতে পারবে না। ফলে শিক্ষার সুফল হবে ব্যক্তিগত, এখানে সেখানে দু একটি মানুষ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যটি উপলব্ধি করতে পারবে, কিন্তু বেশির ভাগ লোকই যে তিমিরে সে তিমিরে থেকে যাবে।
তাই অনুচিন্তার নিগড় থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার যে চেষ্টা চলেছে তা অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন না থাকলে সে চেষ্টাও মানুষকে বেশি দূর নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে হয় না। কারারুদ্ধ আহারতৃপ্ত মানুষের মূল্য কতটুকু? প্রচুর অনড়বব¯ ¿ পেলে আলো হাওয়ার স্বাদবঞ্চিত মানুষ কারাগারকেই স্বর্গতুল্য মনে করে। কিন্তু তাই বলে যে তা সত্যসত্যই স্বর্গ হয়ে যাবে, তা নয়। বাইরের আলো হাওয়ার স্বাদ পাওয়া মানুষ প্রচুর অনড়ববস্ত্র পেলেও কারাগারকে কারাগারই মনে করবে, এবং কী করে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তাই হবে তার একমাত্র চিন্তা। আকাশ-বাতাসের ডাকে যে পক্ষী আকুল, সে কি খাঁচায় বন্দি হবে সহজে দানাপানি পাওয়ার লোভে? অনড়ববস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড়, এই বোধটি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচয়

চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধির স্বাধীনতা, আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা যেখানে নেই সেখানে মুক্তি নেই। মানুষের অনড়ববস্ত্রের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে এই মুক্তির দিকে লক্ষ রেখে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর মানুষটিকে তৃপ্ত রাখতে না পারলে আত্মার অমৃত উপলব্ধি করা যায় না বলেই ক্ষুৎপিপাসার তৃপ্তির প্রয়োজন। একটা বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি রেখেই অনড়ববস্ত্রের সমাধান করা ভালো, নইলে আমাদের বেশি দূর নিয়ে যাবে না।
তাই মুক্তির জন্য দুটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। একটি অনড়ববস্ত্রের চিন্তা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা, আরেকটি শিক্ষাদীক্ষার দ্বারা মানুষকে মনুষ্যত্বের স্বাদ পাওয়ানোর সাধনা। এ উভয়বিধ চেষ্টার ফলেই মানবজীবনের উনড়বয়ন সম্ভব। শুধু অনড়ববস্ত্রের সমস্যাকে বড় করে তুললে সুফল পাওয়া যাবে না। আবার শুধু শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে সুদীর্ঘ সময়ের দরকার। মনুষ্যত্বের স্বাদ না পেলে অনড়ববস্ত্রের চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েও মানুষ যেখানে আছে সেখানেই পড়ে থাকতে পারে; আবার শিক্ষাদীক্ষার মারফতে মনুষ্যত্বের স্বাদ পেলেও অনড়ববস্ত্রের দুশ্চিন্তায় মনুষ্যত্বের সাধনা ব্যর্থ হওয়া অস¤ভব নয়।
কোনো ভারী জিনিসকে ওপরে তুলতে হলে তাকে নিচের থেকে ঠেলতে হয়, আবার ওপর থেকে টানতেও হয়; শুধু নিচের থেকে ঠেললে তাকে আশানুরূপ ওপরে ওঠানো যায় না। মানব উনড়বয়নের ব্যাপারে শিক্ষা সেই ওপর থেকে টানা, আর সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা নিচের থেকে ঠেলা। অনেকে মিলে খুব জোরে ওপরের থেকে টানলে নিচের ঠেলা ছাড়াও কোনো জিনিস ওপরে ওঠানো যায়- কিন্তু শুধু নিচের ঠেলায় বেশিদূর ওঠানো যায় না। তেমনি আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষার দ্বারাই জীবনের উনড়বয়ন সম্ভব, কিন্তু শুধু সমাজ ব্যবস্থার সুশৃঙ্খলতার দ্বারা তা সম্ভব নয়। শিক্ষাদীক্ষার ফলে সত্যিকার মনুষ্যত্বের ফলে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ কথাটা বুলিমাত্র, সত্য। লোভের ফলে যে মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটে, অনুভূতির জগতে সে ফতুর হয়ে পড়ে, শিক্ষা মানুষকে সে-কথা জানিয়ে দেয় বলে মানুষ লোভের ফাঁদে ধরা দিতে ভয় পায়। ছোট জিনিসের মোহে বড় জিনিস হারাতে যে দুঃখ বোধ করে না, সে আর যাই হোক, শিক্ষিত নয়। শিক্ষা তার বাইরের ব্যাপার, অন্তরের ব্যাপার হয়ে ওঠে নি। লেফাফাদুরস্তি আর শিক্ষা এক কথা নয়। শিক্ষার আসল কাজ জ্ঞান পরিবেশন নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি; জ্ঞান পরিবেশন মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায় হিসেবেই আসে। তাই যেখানে মূল্যবোধের মূল্য পাওয়া হয় না, সেখানে শিক্ষা নেই।

শিক্ষার মারফতে মূল্যবোধ তথা মনুষ্যত্ব লাভ করা যায়; তথাপি অনড়ববস্ত্রের সুব্যবস্থাও প্রয়োজনীয়। তা না হলে জীবনের উনড়বয়নে অনেক বিলম্ব ঘটবে। মনুষ্যত্বের তাগিদে মানুষকে উনড়বত করে তোলার চেষ্টা ভালো; কিন্তু প্রাণিত্বের বাঁধন থেকে মুক্তি না পেলে মনুষ্যত্বের আহ্বান মানুষের মর্মে গিয়ে পৌঁছতে দেরি হয় বলে অনড়ববস্ত্রের সমস্যার সমাধান একান্ত প্রয়োজন। পায়ের কাঁটার দিকে বারবার নজর দিতে হলে হাঁটার আনন্দ উপভোগ করা যায় না, তেমনি অনড়ববস্ত্রের চিন্তায় হামেশা বিব্রত হতে হলে মুক্তির আনন্দ উপভোগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই দু দিক থেকেই কাজ চলা দরকার। একদিকে অনড়ববস্ত্রের চিন্তার বেড়ি উন্মোচন, অপরদিকে মনুষ্যত্বের আহ্বান, উভয়ই প্রয়োজনীয়। নইলে বেড়িমুক্ত হয়েও মানুষ ওপরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করবে না, অথবা মনুষ্যত্বের আহ্বান সত্ত্বেও ওপরে যাওয়ার স্বাধীনতার অভাব বোধ করবে, পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো উড়বার আকাক্সক্ষায় পাখা ঝাপটাবে, কিন্তু উড়তে পারবে না।


শব্দার্থ ও টীকা :

নিগড়-শিকল, বেড়ি।
তিমির-অন্ধকার।
ক্ষুৎপিপাসা-ক্ষুধা ও তৃষ্ণা।
ফতুর-নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত।
লেফাফাদুরস্তি-বাইরের দিক থেকে ত্রুটিহীনতা কিন্তু ভিতরে প্রতারণা।
বেড়ি-শিকল, শৃঙ্খল।
হামেশাসবসময়, সর্বক্ষণ।
উন্মোচন-উন্মুক্ত করা।
পিঞ্জরবদ্ধ-খাঁচায় বন্দি।
জীবসত্তা-জীবের অস্তিত্ব। জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অনড়ববস্ত্র চাই।
মানবসত্তা-মানুষের অস্তিত্ব। মানবসত্তা বলতে লেখক মনুষ্যত্বকে বুঝিয়েছেন। শিক্ষার মাধ্যমে এই মনুষ্যত্ব অর্জন করা যায়। অর্থচিন্তার নিগড়ে সকলে বন্দি- লেখকের মতে আমরা জীবসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে অধিক মনোযোগী। ফলে অর্থচিন্তা আমাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে। অর্থচিন্তায় ব্যস্ত মানুষ প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জনে সক্ষম নয়।
কারারুদ্ধ আহারতৃপ্ত মানুষের মূল্য কতটুকু?- খাওয়া-পরার সমস্যা মিটে গেলেই জীবনের উনড়বয়ন সম্ভব হয় না। এ জন্য প্রয়োজন চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধির স্বাধীনতা ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা। শিক্ষার মাধ্যমেই এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

পাঠ পরিচিতি : ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধটি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থের ‘মনুষ্যত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ। মানুষের দুটি সত্তা- একটি তার জীবসত্তা, অপরটি মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব। জীবসত্তার প্রয়োজনে অনড়ববস্ত্রের চিন্তা থেকে মুক্তি এবং শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। শিক্ষার ফলে মনুষ্যত্বের স্বাদ পেলে অনড়ববস্ত্রের সমাস্যার সমাধান সহজ হয়ে ওঠে। শিক্ষার আসল কাজ মূল্যবোধ সৃষ্টি, জ্ঞান দান নয়; জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায়মাত্র।


অনুশীলনী


কর্ম-অনুশীলন
মানব মুক্তির জন্য সমাজের উপরের অংশ ও নিচের অংশের কর্তব্যগুলো নির্দেশ কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:
১। মানুষের অনড়ব-বস্ত্রের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে কোন দিকে লক্ষ রেখে?
ক. অর্থনৈতিক মুক্তির     খ. আত্মিক মুক্তির
গ. চিন্তার স্বাধীনতা        ঘ. বুদ্ধির স্বাধীনতা

২। আত্মিক মৃত্যু বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন ?
র. স্বাভাবিক মৃত্যু
রর. নৈতিক অধঃপতন
ররর. মূল্যবোধের অবক্ষয়

নিচের কোনটি সঠিক?
ক. র ও রর         খ. রর ও ররর
গ. র ও ররর        ঘ. র, রর ও ররর
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে ৩ ও ৪ নং প্রশেড়বর উত্তর দাও :
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শুকুর মিয়া তার স্কুল পড়–য়া ছেলেকে ব্যবসায়ের কাজে নিয়োজিত করেন। তিনি মনে করেন টাকাই জীবনের মূল। দুনিয়াতে যার যত টাকা সে তত বেশি সুখী।

৩। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর দৃষ্টিতে উদ্দীপকের শুকুর মিয়ার মাঝে প্রাধান্য পেয়েছে-
র. ক্ষুৎপিপাসা
রর. আত্মার অমৃত
ররর. অর্থলিপ্সানিচের কোনটি সঠিক?
ক. র ও রর         খ. রর ও ররর
গ. র ও ররর        ঘ. র, রর ও ররর

৪। শুকুর মিয়ার মানসিকতা পরিবর্তন হতে পারে যদি তিনি-
ক. অর্থলিপ্সাকে জীবন সাধনা মনে না করেন
খ. শিক্ষার প্রয়োজনীয় দিককে গুরুত্ব দেন
গ. অর্থচিন্তার নিগড়ে সর্বদা বন্দি থাকেন
ঘ. অনড়ববস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়ে মুক্তিকে বড় করে না দেখেন

সৃজনশীল প্রশ্ন:
সুমন ও শ্যামল বাল্যবন্ধু। দুজনই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। পেশাগত জীবনে সুমন বড় ব্যবসায়ী। গাড়ি, বাড়ি, টাকা-কড়ি কোনো কিছুরই অভাব নেই তার। সবাই তাকে এক নামে চেনে। আর শ্যামল শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। গত সিডরে তাদের গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এ সময় শ্যামল তার ছাত্রদের নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে অসহায় মানুষদের কাছে পৌঁছে দেয়। তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। অথচ সুমন ছুটে এসে সাহায্যের বদলে অসহায় মানুষদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে বিঘার পর বিঘা জমি কিনে নেয়।
ক. মানব জীবনে মুক্তির জন্য মোতাহের হোসেন চৌধুরী কয়টি উপায়ের কথা বলেছেন?
খ. আত্মার অমৃত উপলব্ধি করা যায় না কেন?
গ. উদ্দীপকের সুমনের মাঝে ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের যে দিকটি প্রকাশিত তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. ‘শ্যামলের কাজে শিক্ষার অপ্রয়োজনীয় দিকটি উপস্থিত’ ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধের আলোকে মন্তব্যটি বিশে−ষণ কর।


News all time